01:38am  Saturday, 31 Oct 2020 || 
 ||


সেই ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলেন জাপানে। তারপর বাংলাদেশের সেই মেয়েটি কীভাবে বনে গেলেন জাপানের শীর্ষ মডেলদের একজন? কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন খোদ জাপানি তরুণীদেরই প্রিয় এক ফ্যাশন আইকন? জাপানের টোকিও থেকে লিখেছেন মনজুরুল হক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাপানের শীর্ষ মডেল রোলা। ছবি : রেবেকামিনকফ ডট কমসাম্প্রতিক সময়ে জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্যাশন মডেলদের একজন রোলার নামের সঙ্গে বাংলাদেশ গভীরভাবে সম্পর্কিত। রোলা। ছবি: জাপান টাইমসরোলার বাবা বাংলাদেশি হওয়ায় এই তরুণীর নামের সঙ্গে বাংলাদেশের নামটিও প্রায় সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত হয়ে আছে, যদিও অন্য নেতৃস্থানীয় ফ্যাশন মডেলদের বেলায় তা হচ্ছে না। এটা হয়তো জাপানি জীবনে হাফু, অর্থাৎ মিশ্র যুগলের সন্তানদের প্রায়ই মোকাবিলা করতে হওয়া একধরনের বিড়ম্বনা, যার চমৎকার উল্লেখ সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে করেছেন ইদানীংকার আরেক জাপানজয়ী হাফু তরুণী আরিয়ানা মিয়ামোতো। আরিয়ানা কিছুদিন আগে জাপানের মিস ইউনিভার্স নির্বাচিত হয়েছেন এবং আগামী বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় জাপানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মনোনীত হয়েছেন। রোলার মতো আরিয়ানাও মিশ্র যুগলের সন্তান। তবে রোলাকে যেসব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এখনকার পর্যায়ে যেতে হয়েছে, আরিয়ানার বেলায় তা ছিল অনেকাংশেই অনুপস্থিত। রোলা অর্ধেক বাংলাদেশি হলেও ওর অন্য অর্ধেক পুরোপুরি জাপানি নয়। রোলার মা জাপানি-রুশ মিশ্র যুগলের কন্যা। সেদিক থেকে সিকি ভাগ জাপানি পরিচয় নিয়ে জাপান জয়কে বিশাল জয় অবশ্যই আখ্যায়িত করতে হয়। জাপানি ধারার সাজে রোলা, বিজ্ঞাপনের প্রিয় মুখ রোলাফ্যাশন ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হওয়ার পর বাবার স্খলনের কারণে জাপানের সংবাদমাধ্যমে রোলাকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে। দুবছর আগের সেই ঘটনায় তরুণীর মডেল জীবনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করতে শুরু করলেও রোলা কিন্তু তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। টোকিওর জেলা আদালত কিছুদিন আগে এক রায়ে রোলার বাবাকে অপরাধী চিহ্নিত করে আড়াই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। চার বছরের জন্য স্থগিত সেই দণ্ডাদেশ অপরাধী ওই সময়ের মধ্যে অন্য কোনো অপরাধে জড়িত না হলে কার্যকর হবে না। অনেকে মনে করছেন, পারিবারিক জীবনের সে রকম উত্থান-পতন বরং জাপানিদের মধ্যে ওকে নিয়ে একধরনের সহানুভূতির মনোভাব তৈরি করে দিয়েছে। তরুণী রোলার জনপ্রিয়তাকে তা আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে জাপানের তারকা জগতের প্রতিষ্ঠিত এক ব্যক্তিত্ব এখন রোলা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়ার পর বাল্যকালে বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশে কাটানো এবং পরবর্তী সময়ে বাবার সঙ্গে মায়ের সান্নিধ্য ছাড়া বেড়ে ওঠা, এসব নানা রকম প্রতিকূলতা পার হয়ে আসতে পেরেছেন বলেই হাফু হওয়া সত্ত্বেও জাপানিরা আজকাল রোলা নিজেদের খুবই কাছের একজন বলে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর সেই গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে বাংলাদেশের নামটি উচ্চারিত হওয়ায় আমাদের মধ্যেও তা এনে দিচ্ছে একধরনের তৃপ্তির বোধ। দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন জগতে তাঁর গর্বিত পদচারণ আরও অনেক দিন বজায় থাকুক, সেই কামনা এখন প্রবাসীদের সবাই করছেন। অধরা রোলা রোলার বাবার বাড়ি বাংলাদেশের বিক্রমপুরে। রোলার মায়ের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন আগে। রোলার জনপ্রিয়তা জাপানে এমনই আকাশচুম্বী যে তাঁর কাছাকাছি পৌঁছানো সহজ নয়। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে হলো। তাঁর এজেন্সি কোনোভাবেই অনুমতি দিতে রাজি নয়। বেশ কয়েকটা সূত্রে চেষ্টা করেও শেষমেশ রোলার সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব হলো না। দেখা দিক আর না দিক বাংলাদেশকে যে জাপানিদের কাছে বেশ ভালোভাবেই তিনি তুলে ধরেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ থেকে জাপানে পাড়ি জমিয়ে রোলার এই উত্থান সত্যিই বিস্ময়কর! রোলা এখন জাপানে জনপ্রিয় এক ফ্যাশন আইকনের নাম। ছবি: এএফপি মানুষ আমাকে অনুকরণ করে, ভালোই লাগে। রোলা টেলিভিশন খুললেই চোখে পড়বে রোলাকে। এই বাংলাদেশি-জাপানি মেয়েটির রাজত্ব বিলবোর্ড এমনকি টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন বিরতিতেও। ছোট পানপাতার মতো মুখ, লম্বা পা, স্নিগ্ধ হাসি, মুগ্ধতার আবেশ ছড়ানো কমনীয়তা-সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বে রোলা জয় করেছেন হাজারো জাপানির হৃদয়। অথচ এই জনপ্রিয় মডেলের মুখাবয়ব আর দশটা জাপানি মেয়ের মতো নয়। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ আর রাশিয়ার নাম। বাবা বাংলাদেশি। মা অবশ্য পরিপূর্ণ জাপানি নন; বরং বলতে হবে অর্ধেক জাপানি, অর্ধেক রুশ। কৈশোরের একটা বড় অংশ কেটেছে বাংলাদেশে। নয় বছর বয়স পর্যন্ত ছিলেন বাংলাদেশে। এরপর মা-বাবার সঙ্গে চলে যান জাপানে। শুরুর দিকে ভাষা, সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কষ্টই করতে হয়েছে। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনে নানা ধাক্কা তো ছিলই। মা-বাবার ছাড়াছাড়ি; পরে অপরাধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বাবার গ্রেপ্তার হওয়া নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রোলা এগিয়ে গিয়েছেন তরতরিয়ে। মডেলিংয়ে হাতেখড়ি হাইস্কুলে পড়ার সময়। সময়ের ভেলায় চড়ে পরিণত হয়েছেন জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাশন মডেল ও টিভি ব্যক্তিত্বে। জাপানি টিভিগুলোয় নিয়মিতই দেখা যায় মনোবিজ্ঞানী ইয়েকো হারুকাকে। রোলার জনপ্রিয়তার মাপকাঠি বোঝাতে তিনি বললেন, জাপানি তরুণীরা তো রোলার মতো হতে চায়। রোলা যে পোশাক পরে, যে ব্যাগ ব্যবহার করে তারাও সেটি কেনে। রোলা অবশ্য ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে বেশ তাড়িয়ে উপভোগ করেন। বললেন, মানুষ আমাকে অনুকরণ করে, ভালোই লাগে। তবে বাংলাদেশ থেকে জাপানে আসার শুরুর দিনগুলোয় রোলাকে যথেষ্ট ঝামেলাই পোহাতে হয়েছিল। ভাষাগত সমস্যাটা বেশ ভুগিয়েছিল। তবে স্বভাবসুলভ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে সে সমস্যা উতরে যেতে খুব একটা বেগও পেতে হয়নি। যেবার এলেমেন্টারি স্কুলে (প্রাথমিক বিদ্যালয়) ভর্তি হলেন, ভুলে স্কুলের নতুন পোশাকের বদলে পরে গিয়েছিলেন পাজামা! স্মৃতির পাতা উল্টে বললেন, যদি মানুষের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ না করতে পারেন, স্বাভাবিকভাবেই সেটা হতাশার। তবে শৈশবের কিছু মজার স্মৃতি আছে। ছোটবেলায় বার্বিডল নিয়ে খেলতাম। পরে নদীতে ছেলেদের সঙ্গে বাগদা চিংড়ি ধরতাম এবং কচ্ছপ নিয়ে খেলতাম। সম্ভবত এসব কারণেই আমি হাত দিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করতে পারি। সহজাতভাবেই বন্ধুত্ব তৈরি করেছি। বিপুল জনিপ্রয়তা মোটেও চাপ মনে করেন না রোলা। বললেন, রাস্তাঘাটে মানুষ যখন আমার কাছে আসে হাই রোলা বলে, মনে হয় আমি তাদের বন্ধু! মডেলিংয়ে ব্যস্ততার ফাঁকে রোলার সময় কাটে জিম কিংবা মাছ ধরায়। হয়তো মনের কোণে কখনো কখনো উঁকি দেয় ফেলে আসা শৈশব, যেখানে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশেরও নাম। এএফপি অবলম্বনে মো. রানা আব্বাস রোলা কেন জনপ্রিয়? রোলা কেন জাপানিদের এত পছন্দ? সে প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিকু মাকিনো জাপানে মেয়েদের ফ্যাশন যুগের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতিটি যুগে শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন মডেলের আবির্ভাব দেখা যায়মেয়েরা সবাই-ই তাদের পোশাক আর চালচলন অনুসরণ-অনুকরণের চেষ্টা করে। আমাদের এই সময়ের সে রকম শীর্ষ ফ্যাশন মডেলদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছেন কিয়ারি পামিইয়ু পামিইয়ু, নিশিনো কানা এবং রোলা। কিয়ারি পামিইয়ু পামিইয়ুর চুলের স্টাইল আর রং সব সময় স্বতন্ত্র আর চটকদার। এ ছাড়া রঙিন পোশাকের সঙ্গে রিং, চুড়ি ও অন্যান্য অলংকারের ব্যবহারও তাঁকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। কিয়ারি পামিইয়ু পামিইয়ু শুধু মডেলিং করছেন না, গায়িকা হিসেবেও সারা বিশ্বে তিনি জনপ্রিয়। নিশিনো কানাও হচ্ছেন একজন গায়িকা। প্রেমের গান গেয়ে মেয়েদের সহানুভূতি বেশি পাওয়া যায় বলে মেয়েদের মধ্যে তিনি খুব জনপ্রিয়। সব সময় প্রেমের ধারণার উপযোগী স্কার্ট আর পশমি পোশাক তিনি পরেন। চুলের স্টাইলও ঘন ঘন বদল করে নেন। আমাদের এই প্রজন্মের তৃতীয় জনপ্রিয় ফ্যাশন মডেল রোলার বাবা বাংলাদেশি। জাপানের শীর্ষ মডেল হিসেবে পত্রপত্রিকায় বর্তমানে ব্যাপক প্রচার পাচ্ছেন। রোলার নাম ব্যবহার করা রঙিন কন্টাক্ট লেনসও আজকাল কিনতে পাওয়া যায়। তাই রোলার ভক্ত অনেক মেয়ে এখন সে ধরনের লেন্স ব্যবহার করে রোলার মতো হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। রোলা প্রতিদিন সে দিনটির উপযোগী করেই সাজসজ্জা করেন বলে প্রতিদিনই তাঁকে যেন ভিন্ন এক মানুষ বলে মনে হয়। রোলার চমৎকার সব সাজসজ্জা ও ভাবভঙ্গি অনুকরণ করে মেয়েদের অনেকেই আজকাল রোলা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। শুধু একটি মাত্র ফ্যাশন স্টাইলে রোলা নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন না। বরং ফ্যাশনের বিভিন্ন ধারা তিনি অনুসরণ করেন। যেমন আড়ম্বরপূর্ণ ফ্যাশন, কুল ফ্যাশন, হাইব্রিড ফ্যাশন, প্রতিদিনের ফ্যাশন, মেয়েলি ফ্যাশন এবং পুরুষসুলভ ফ্যাশন। প্যান্ট এবং সেই সঙ্গে স্কার্টেও রোলাকে খুব আকর্ষণীয় লাগে বলে আজকাল অনেক মেয়েই তাঁর মতো পোশাকই পরতে চায়।

 

প্রিয় মুখ



Editor : Husnul Bari
Address : 8/A-8/B, Gawsul Azam Super Market, Newmarket, Dhaka-1205
Contact : 02-9674666, 01611504098

Powered by : Digital Synapse