07:41am  Sunday, 01 Nov 2020 || 
 ||


ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্ক সদস্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে আমন্ত্রিত ছিলেন বাংলাদেশ সংসদের প্রথম মহিলা স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী৷ ওই সময় কলকাতার দৈনিক সংবাদ প্রতিদিন তার একটি সাক্ষাৎকার নেয়। সাক্ষাৎকারটি আজ মঙ্গলবার পত্রিকাটি ছেপেছে। প্রশ্ন: চারদিনের ভারত সফরে আপনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করলেন৷ কোন উপলব্ধি নিয়ে ঢাকা ফিরছেন? শিরিন: প্রথমত, এবারের ভারত সফর বিষয়টা অন্যমাত্রার ছিল৷ ভারতের নির্বাচনের পরে নতুন প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্ক সদস্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল৷ ভারতে আগে কখনো কোনো প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এভাবে সার্ক দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি৷ ফলে রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠান একটি অন্য মাত্রা পায়৷ এত সুন্দর অনুষ্ঠান হয়েছে যে, আমি বেশ মুগ্ধ হয়েছি৷ সার্ক সদস্যদের রাষ্ট্রনেতারা সকলেই এসেছিলেন৷ একমাত্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্বনির্ধারিত জাপান সফরে যাওয়ার জন্য আসতে পারেননি৷ আমি তাকে প্রতিনিধিত্ব করেছি৷ এই সুযোগে সকল সার্ক রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও সৌজন্যমূলক আলাপ করার সুযোগ হয়েছে৷ আপনারা জানেন, আগামী নভেম্বর মাসে নেপালে সার্ক সম্মেলন হওয়ার কথা আছে৷ তার আগে এমন ঘরোয়া মিলনমেলার সুযোগ করে দেয়া এবং বিজেপি দলের এমন জয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানাই৷ অভিনন্দনপত্র আমি তার হাতে তুলে দিয়েছি৷ শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি দেখে মনে হয়েছে গণতন্ত্রের বিজয়োৎসব৷ লক্ষ করলেই দেখবেন অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সদ্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন৷ বলা যেতে পারে সার্কের সব দেশেই এখন গণতান্ত্রিক পথে নির্বাচিত সরকার৷ এটাই উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে দেয়৷ গণতন্ত্রই যে শেষ কথাএই অনুষ্ঠান তার প্রমাণ৷ এই সুযোগে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার এক বার্তা এই অনুষ্ঠান থেকেই গিয়েছে৷ প্রত্যেকেই উপলব্ধি করেছেন একুশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার চ্যালেঞ্জগুলোকে সমাধান করার জন্য যৌথভাবে উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে৷ প্রত্যেক রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা রয়েছে৷ কিন্ত্ত সেই দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোকে নিজেদের মধ্যেই সমাধান করে নেওয়া যেতে পারে৷ কিন্ত্ত দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো যেন সার্ক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়এমন একটা চিন্তা সকলের মধ্যেই দেখেছি৷ প্রত্যেক দেশ একে-অপরের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিজেদের দেশে রূপায়ণ করতে পারেযেমন, বাংলাদেশ মানবসম্পদ উন্নয়নে যে সাফল্য পেয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা অন্য দেশ গ্রহণ করতে পারে৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজেও তাই মনে করেন৷ প্রশ্ন: আপনি ইউপিএ আমলে ভারত সফর করেছেন৷ এবার ভারতে নতুন সরকার এনডিএ-র৷ বাংলাদেশ বিষয়ে নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয়েছে? শিরিন: আমি তো কথা বলে দেখেছি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন৷ তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের কথা শুনেছেন৷ আলোচনার সময় তিনি বারবার বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের প্রসঙ্গ এনেছেন৷ সেই '৭১ সালের কথা তুলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন৷ অত্যন্ত খোলামনে আলোচনা করেছেন৷ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, সেইগুলোর দ্রূত সমাধান করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন৷ আমার তো ওনাকে ভীষণ ইতিবাচক মনে হয়েছে৷ প্রশ্ন: ভারত সরকার চাইছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আসুন৷ এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে? শিরিন: দেখুন, গত ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ২০০১ সালে ভারতে এসেছিলেন৷ তারপর ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় ফিরতি সফর করেন৷ এখন প্রেক্ষাপট বদলে গিয়েছে৷ কেননা, বাংলাদেশে দশম সংসদ নির্বাচনের পরে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে৷ ভারতেও নির্বাচনের পরে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে৷ তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকায় আসতে অনুরোধ করা হয়েছে৷ আমি সেই আমন্ত্রণের পুনরুক্তি করেছি৷ প্রধানমন্ত্রী মোদি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন৷ প্রশ্ন: রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কী কথা হল? শিরিন: রাষ্ট্রপতি বলছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার উন্নতি ও স্হিরতার জন্য দেশগুলোর মধ্যে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করাই প্রাথমিক উদ্দেশ্য হওয়া উচিত৷ এই অঞ্চলের উন্ন্য়নের প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে৷ সেইসব বিষয়ে যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে৷ তিনি এও বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যেসব অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, তার নিষ্পত্তি করার জন্য ভারত সরকার প্রতিশ্রূতিব৷ তিনি এই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য গুরুত্ব আরোপ করেছেন৷ প্রশ্ন: রাষ্ট্রপতি ভবনের নৈশভোজের অভিজ্ঞতা কেমন? শিরিন: চমৎকার৷ আমি রাষ্ট্রপতিকে এর জন্য অভিনন্দন জানিয়েছি! সার্ক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে এক টেবিলে ছিলাম৷ সকলের সঙ্গে আন্তরিক আলোচনা হয়েছে৷ প্রত্যেকে বৃহত্তর স্বার্থ নিয়েই আলোচনা করছিলেন৷ আরও ভাল লাগল বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-ও এক টেবিলে ছিলেন৷ এটাই গণতন্ত্রের উজ্জ্বল নজির৷ সরকার ও বিরোধী পক্ষ নির্বাচনের সময়কার বিতর্ক ভুলে এক টেবিলে অভিন্ন্ বিষয় নিয়ে কথা বলছেন৷ এটা নিঃসন্দেহে এক নজির৷ প্রশ্ন: নির্বাচনের সময় বাংলাদেশ-অনুপ্রবেশ প্রচারের বিষয় ছিল৷ এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে? শিরিন: আলোচনায় এই বিষয় ওঠেনি৷ কেউ তোলেননি৷ সীমান্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ আমাদের প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্হা জোরদার করেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী মোদি তা স্বীকারও করেছেন৷ এই বিষয়ে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সরকারি স্তরে আলোচনা হবে৷ আমার সঙ্গে সার্বিক দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের নীতি নিয়ে কথা হয়েছে৷ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করতে ভারত সরকার আগ্রহী৷ তবে সংসদের নিয়মাবলির মধ্যেই তা হবে বলে বিশ্বাস করি৷ প্রশ্ন: তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি ছাড়া বাংলাদেশের অগ্রাধিকার আর কী? শিরিন: আরও নিবিড় আর্থিক সম্পর্ক ও বিদ্যুত্ বিষয়ে সহযোগিতা৷ গত পাঁচ বছরে যে বোঝাপড়া হয়েছে দুই সরকারের মধ্যে, তাকে আরও সম্পৃক্ত করা৷ শুল্ক ছাড় তো রয়েছেই৷ কিন্ত্ত তার বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত৷ আলোচনায় বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মায়ানমার) আর্থিক করিডর গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ এই প্রকল্প শীঘ্রই বাস্তবায়ন হতে পারে৷ ভারত আগ্রহী বলে মনে হয়৷ প্রশ্ন: ভারতে এবার নদী উন্নয়ন নিয়ে নয়া মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে৷ এই বিষয়ে আপনার মতামত কী? শিরিন: এই বিষয়কে স্বাগত জানাচ্ছি৷ পানির সমস্যা এখন বিশ্বের আলোচনার বিষয়৷ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন্ চুয়ান্নটি নদী রয়েছে৷ সেইগুলোর বিষয়ে যৌথভাবে সহযোগিতার রাস্তা তৈরি করতে আশা করব নয়া মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেবে৷ নদী উপত্যকা ম্যানেজমেণ্ট এখন যৌথ উদ্যোগে হওয়া উচিত৷ ইতিমধ্যেই গঙ্গা নদী নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে উপত্যকা পরিচালন ব্যবস্হা রয়েছে৷ তেমনি ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়েওভারত-বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো রয়েছে৷ একে আরও সমৃদ্ধ করা উচিত৷ প্রশ্ন: স্পিকার হিসাবে কোনো প্রস্তাব দিয়েছেন? শিরিন: ভারত ও বাংলাদেশ সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটির মধ্যে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছি৷ বিশেষ করে সামাজিক বিষয়ের ওপর দুই দেশের সাংসদরা যৌথ সমীক্ষা করে রিপোর্ট দিতে পারেন নিজ নিজ সরকারের কাছে৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন৷ বলেছেন, এটা করা যেতে পারে৷ প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রীকে কোনো উপহার দিলেন? শিরিন: আমরা দিয়েছি৷ উনিও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের জন্য উপহার দিয়েছেন৷ রাষ্ট্রপতি আমাকে মহাত্মা গান্ধীর জীবনীর ওপর একটি বই উপহার দিয়েছেন৷ তাতে তিনি নিজের কথাও লিখেছেন৷ এটা অমূল্য উপহার৷

 

আড্ডা



Editor : Husnul Bari
Address : 8/A-8/B, Gawsul Azam Super Market, Newmarket, Dhaka-1205
Contact : 02-9674666, 01611504098

Powered by : Digital Synapse